Skip to main content

পুষ্পাঞ্জলির বিবর্তন ||-কৃষ্ণেন্দু সাঁতরা






মেয়েদের দলটা পুজোর এক-সপ্তাহ আগে বয়েজ-স্কুলের স্যারদের একটা বীণার ছবি আঁকা- চিঠি দিয়ে নেমন্তন্ন করে গিয়েছিল।আর একটা বছর-সতেরোর বয়েজ-স্কুলের ছেলের দল, সরস্বতীপুজোর দিন গার্লস স্কুলে ঢুকলো পুষ্পাঞ্জলি দিতে এবং সমবেত  মন্ত্র উচ্চারণের ফাঁকে ফাঁকেই চোখের দৃষ্টি বারংবার ছুঁয়ে গেল-নিত্য ফ্রকপড়া ক্লাস-এইটের হঠাৎ 'শাড়ি পড়া' সাহসী চোখে।বা অঞ্জলির সব ফুল মাতৃচরণের স্পর্শ পেল না এবং কিছুফুল উড়ে গেল শ্যাম্পুকরা আনমনা কেশরাশি লক্ষ্য করে।অলিখিত একটা বাংলা প্রেম দিবসে-দুটি সাইকেল পাশাপাশি সমান্তরাল এবং সরলরৈখিক চলে যাচ্ছে একটা স্কুল দু'টো স্কুল -বাজার চত্বরের পাশ দিয়ে সিনেমা হলের দিকে......।না!এসব বাজে কথা নয়।

এটাই সমাজের বিবর্তন যা ধরে এগিয়ে গেলে হয়তো- আপনি দু'একটা নতুন প্রেমের সূচনা পর্বের আজও সাক্ষী হতে পারেন ।এখন সরস্বতী পূজায় সেই -'বাংলা প্রেম দিবস' জাতীয় বিষয়টা কমে যাচ্ছে আর জায়গা নিচ্ছে 'সেলফি'কেন্দ্রিক- একটা  'ডিজিটাল একলা'-র জগৎ। আমি কতদূর কী বুঝিয়ে বলতে পারব জানি না......এখনের ছেলে-মেয়েরা 'প্রেমিক প্রেমিকা' হওয়ার থেকেও বেশি পছন্দ করছে-'ক্রাশ-হয়ে'  কাটিয়ে দেওয়া, আর অন্যদল 'ক্রাশ-খেয়ে'! যদিও কোনটাই হেয় করার নয়-সবটাই যুগধর্মের সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে এবং সেটাই স্বাভাবিক ।

হয়তো যুগধর্মের নিয়মেই-দেবী সরস্বতীর রূপের বা আঙ্গিকের পরিবর্তনও হয়েছে বারংবার। প্রতিমা শিল্পীর বাড়ি ঘুড়ে অনেক প্রতিমা দেখলাম।প্রতিমারা আর কিছু সময় পর মন্ডপে রওনা দেবে।কিছু প্রতিমা ট্রাডিশনাল আর কিছু প্রতিমার গঠন শৈলী সাহসী।একটা প্রতিমার সামনে চমকে-থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম।
অনেকেই হয়তো বলবেন- 'এ কেমন প্রতিমা?আমাদের পাড়ার সেলফি তোলা সরকারদের মেয়েটার মতো না!'।হ্যাঁ,প্রতিমা তার গড়ন শৈলী পাল্টাচ্ছে ।আগের বছর স্কুটিতে করে যে দেবীর ছবি স্যোশাল মিডিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল তাও কিন্তু পরিবর্তিত সময়ের চাহিদা মেনেই- কোন এক ক্লাবের ছেলে-মেয়েদের অর্ডার মতোই কোন এক মৃৎশিল্পীর গড়ে তোলা প্রতিমা।






একদল আমরা" বলেছি-"রুচিবোধ নিম্নগামী হচ্ছে "! আবার একদল বলেছি- সময়ের দাবি মেনে শিল্প তার 'ফর্ম' পাল্টাচ্ছে।যেমন একসময় সরস্বতী ঠাকুরের- বুদ্ধমূর্তি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল  বা দুটি-হাসের লেজ জুড়ে গিয়ে একটা সিংহাসনে বসা -সরস্বতীর আশীর্বাদের হাতে চাঁদমালার মাতৃমূর্তিটি। প্রতিমার চিরায়ত আঙ্গিকেরও পরিবর্তন হয়েছে।ট্রাডিশনাল ফর্মুলাতেও বাদ্যযন্ত্রটির আঙ্গিক পাল্টেছে এবং হাতও।সজ্জায় কাপড়ের ধরণ, গহনার ধরণ ইত্যাদি ইত্যাদি ।

দুর্গাপুজোর মতো বা কালিপুজোর মতোই থিমের প্রভাব সর্বত্রগামী হয়ে গেছে।অর্থাৎ একটা ভাবনা বা চিন্তনকে -প্রতিমার অনুষঙ্গে সকলকে জানাতে হবে বোঝাতে হবে-এই বোধ সমাজে কাজ করে বা যদি সরস্বতী পুজোর ক্ষেত্রে ধরি তবে তা যুবসমাজ প্রভাবিত বা বয়ঃসন্ধির আবেগ প্রভাবিত ।কারণ সরস্বতী আরাধনায় যে বয়সের ছেলে মেয়েরা সক্রিয়তা দেখায় সেখানে-শৈশব কৈশোর এবং  বয়ঃসন্ধি আর যৌবনের আধিক্য ।শিল্পকলার দেবীর আরাধনায় যে শিল্পী-মনের প্রকাশ ঘটছে তাই হয়তো আধুনিক মনন।তাকে অস্বীকার করে প্রজন্মকে দোষারোপ করাটা সহজ কিন্তু তা কী যুক্তি সম্মত? যদি তাই হয় তবে আমাদের কৈশোর বা বয়ঃসন্ধির ফুল-ছোড়াটা ভুল ছিল বা পাশাপাশি প্রথম হাত ধরে, হেঁটে যাওয়া শাড়িপড়া-কিশোরী আর সদ্য-গোঁফ গজানো ছেলেটাও খুব জঘন্য আর খারাপ ছিল?

যাক!নিয়ম মেনে- আবার সরস্বতী পুজো আসছে ।সুতরাং গেট রেডি-ফর প্রার্থনা- "এবারের মতো পাস করিয়ে দাও মা.....প্লিজ! "হয়তো মা তখন সন্তানদের সাথে মৃদু মস্করা করে বলবেন- "পুজোর আগে কুল খাওয়ার সময় মনে ছিল না? সারারাত চ্যাটে ব্যস্ত থাকার সময় মনে ছিল না? বইকেনার টাকায়- অ্যামাজন প্রাইম রিচার্জ করে অ্যাভেঞ্জার্স সিনেমা দেখার সময় সর্বশক্তিমান হিসেবে কাকে মনে ঠাঁই দিয়েছিলে বৎস?"
-" আর হবে না- মা!এবারের মতো পাস করিয়ে দাও গো মা।"
-"তথাস্তু!সব পাশ।"







Popular posts from this blog

রোদজাতক-৭ ৷৷ রত্না সোম

রোদজাতক-৭ ৷৷ রত্না সোম চিরকাল শুধু সংখ্যা আমরা চিরদিন পদাতিক তোমরা দিয়েছ গালভরা নাম পরিযায়ী শ্রমিক। ঘর ছিল এক ঠিক ঘর নয় খিদে সেখানেও বালাই পেটসন্ধানী এ অলি ও গলি হাড় ভেঙে জোটে ছাই। সেও কি জোটে ! তেনার মর্জি লক্ আউট আর ডাউন ভবিতব্যের এ পিঠ ও পিঠ আমিই বনেছি ক্লাউন। মরার অনেক অপশন তবু নাছোড় চেষ্টা বাঁচার করোনা এড়ালে থাবা পেতে আছে নিশ্চিত অনাহার। গাড়ি চাপা আছে , আছে ঘুমন্ত বুক পিষে যাওয়া রেলে এমন কত কি মরেই তো রোজ মশা মাছি এলেবেলে! মরলে সংখ্যা শহীদ হয় না বরং হিসেবে কমে দরদী ভাষণে বাহারি প্যাকেজ নাটক দিব্বি জমে। প্রশ্ন এটাই হেঁটে আসি কেন রাস্তায় রেলপথে টাকার পেটোয়া "বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে ।" কি পেলে আর কি কি না পেলে রাস্তাই অবশেষ কোনদিন তুমি বুঝবে না ঠিক সভ্য লোকের দেশ। হাড়ে হাড়ে কত দাগ জমে আছে সব ক্ষত চাবুকের একদিন পেশী স্বাদ বুঝে নেবে চাওয়া পাওয়া গতিফের। পাপকে জমাও আরো ঘন হোক বিস্ফোরণের আগে খাও পিও আর মৌজ করে নাও যদি ভলক্যানো জাগে --- পুড়বে ডানার স্বস্তি পুড়বে বাসার আলোও ঠিক সভ্যতা ফের গড়তে লাগবে পরিয...

রোদজাতক-৬ ৷ রত্না সোম

রোদজাতক-৬ ৷৷ রত্না সোম রোদজাতক-৬  স্পষ্ট বললে - আরও কতগুলো যুদ্ধজাহাজ ঢেউয়ের দিকে অস্ত্র তাক করে বসে থাকত। স্পষ্ট করে বললে -  পারমাণবিক গবেষণাগারে বন্দি বিজ্ঞানের পিঠে চাবুক কষিয়ে আদায় করে নেওয়া হত আরও মারাত্মক কোন বিস্ফোরণ । স্পষ্ট কথা বললে - সীমান্তে কাঁটাতারের মুখ রক্ত দিয়ে লাল রঙ করে নেওয়া হত বিপদ সংকেত । স্পষ্ট ভাষায় বললে -  সব আকাশের ডানা ছেঁটে দিয়ে খাঁচায় পোষ মানানোর টুকরো কবিতা লিখতে বাধ্য করা হত। স্পষ্ট অক্ষরে বিঁধলে - সমস্ত পাঠশালাদের দু চোখে বেঁধে দেওয়া হত অন্ধত্বের নাম নিশানা । স্পষ্ট সুরে গাইলে - সব গানের টুঁটি চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলার চেষ্টায় ভালরকম বুঝিয়ে দেওয়া হত আর্তনাদ কাকে বলে । স্পষ্ট হাতের লেখায় লিখলে -  সব কাগজ কালি কলমের বিরুদ্ধে বিশেষ আদালত বসানো হত -  স্পষ্ট প্রোগ্রামিং ঘেঁটে ঘ করে কম্পিউটারকে যে কোন সময় নির্বোধ বানিয়ে দেওয়াকে মানবিক অধিকারের তকমা পরানো হত। স্পষ্ট শ্লোগানকে বিনা বিচারে কয়েদ করে রাখার জন্য আনা হত নতুন আইনের হা হা হা হা - তাই ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের মত কুয়াশার সবকিছু অ...

বৃষ্টি সন্ধানী ।।অমিতাভ সেনগুপ্ত ।।ধারাবাহিক অনুবাদ-১

বৃষ্টি সন্ধানী ।।অমিতাভ সেনগুপ্ত ।।ধারাবাহিক অনুবাদ-১ (Chasing the Monsoon-Alexander Frater থেকে অনুবাদ) (কপিরাইট- অমিতাভ সেনগুপ্ত ।। বাণিজ্যিক কারণে ব্যবহৃত নয়।)  (১) প্রথম যে শব্দ শুনি তা ছিল বৃষ্টি পড়ার। মনে হয় একধরনের ধাতব ভার ও ভর থাকে উষ্মমন্ডলীয় বর্ষার। সেটাই অঝোর ঝরছিল যখন আমার মায়ের প্রসব ব্যাথা শুরু হয় দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্তমহাসাগরীয় দ্বীপের ছোটো মিশন হাসপাতালে। বৃষ্টি ঝরেই চলেছিল তাঁর প্রসব কালে। আমি ভূমিষ্ঠ হবার কিছু পরেও শোঁ শোঁ আওয়াজে বাইরের ঘন পত্রগুচ্ছের আড়াল ঠেলে ঝালাই করা লোহার ছাদে বাজনা বাজাচ্ছিল বৃষ্টি। মাকে প্রসব করাচ্ছিলেন আমার বাবা। যে কোনো দিকেই বহু হাজার মাইলের মধ্যে উনিই তখন একমাত্র চিকিৎসক। সপ্তাহে বহুবার জরুরি কলে যেতেন মোটর বোটে । অধিকাংশ সময় প্রত্যন্ত গ্রাম, জনবসতিতে রোগীর কাছে পৌঁছতে পাড়ি দিতেন দূর দূরান্ত। সুতরাং তাঁর কাছে নিছক কৌতুহলের বিষয় ছিল না আবহাওয়া । ক্রমাঙ্ক করা কাচের বৃষ্টি মাপার যন্ত্র, হাসপাতালের বাগানে রাখা লড়ঝড়ে বায়ুমানযন্ত্র দিয়ে বৃষ্টি মাপতেন এবং নোটবন্দী করতেন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, রোদের ঘন্টা মিনিট, বাতাসের গতি ও নিশানা...